যিনি যা চেয়েছেন তিনি তা পেয়েছেন (২)
শায়খ আবুল ফুতুহ ইবনে খাদ্বিরী কোরআন-ই মজীদ ছয়মাসে হিফয করে ফেলেছেন। তার জন্য সেটা হিফজ করা সহজ হয়ে গেলাে। ইতােপূর্বে এটা তার জন্য অতি কঠিন কাজ ছিলো। তিনি সপ্ত কিরআত রপ্ত করেছেন এবং হাদীস শরীফের বহু কিতাবও লিপিবদ্ধ করে নিয়েছেন। সেগুলাে সবসময় মানুষকে পড়ে শুনাতেন এবং মানুষকে উপকৃত করতে (শেখাতে) থাকেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি এ পূণ্যময় কাজগুলাে করতে থাকেন। কিন্তু আমার অবস্থা এ হলাে যে, শায়খ রদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু আমার বক্ষের উপর হাত মুবারক রাখলেন, যখন আমি তার সামনে তার মজলিসে উপবিষ্ট ছিলাম। তখনই আমি আমার বক্ষে একটি নূর পেলাম। আর আমি এখনাে তা দ্বারা হক ও বাতিলের মধ্যে এবং হিদায়ত ও গােমরাহীর অবস্থাদির মধ্যে পার্থক্য করে নিতে পারি। ইতােপূর্বে আমি নানা সন্দেহের কারণে অস্থির থাকতাম।
আবু আবদুল্লাহ ইবনে হুরাইরাহ-এর এ অবস্থা হলাে যে, তিনি মন্ত্রীর নায়েব (প্রতিনিধি) নিযুক্ত হলেন।
আর আবুল ফুতুহ ইবনে হিবাতুল্লাহ খলীফার প্রাসাদে ওস্তাদ নিযুক্ত হন। তাছাড়া, আবুল কাসিম ইবনুস সাহিব বাবুল আযীবের দারােয়ান (রক্ষক) নিযুক্ত হলেন। আর দীর্ঘদিন যাবৎ তারা ওই সব পদে বহাল (কর্মরত) ছিলেন। আবুল ফুতুহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়ুসুফ ক্বাত্ফিনী বলেন, আমি দু’শায়খ অর্থাৎ শায়খ আবূ আমর ওসমান ইবনে ইয়ুসুফ সুলায়মান প্রকাশ কাসীর (খাটো)-এর নিকট বাগদাদে ৬৩৫ হিজরীর মুহাররম এবং শায়খ আবুল হাসান আলী ইবনে সুলায়মান, প্রকাশ নানবাঈ'কে বাগদাদে ৬৪৩ হিজরীতে শুনেছি। তারা উভয়ে বলছিলেন, “শায়খ খলীল সরসরী তাঁর ওফাতের সাতদিন পূর্বে কুত্বব হয়ে গিয়েছিলেন।” আর খবর দিয়েছেন আমাদেরকে ফক্বীহ আবুল হাসান ইবনে হিবাতুল্লাহ ইবনে সাঈদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইয়েমেনী যুবায়দী শাফেঈ রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কায়রােতে ৬৭০ হিজরীতে। তিনি বলেন, আমি আমাদের শায়খ শাইখ-ই পেশওয়া আবুল গায়স আবদুল্লাহ্ ইবনে জবল ইয়েমেনী রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুকে, ৬৩৪ হিজরী রজব মাসে বলতে শুনেছি, এক ব্যক্তি, যাঁকে শায়খ খলীল সরসরী বলা হতাে, বাগদাদে তার ইনতিকালের সাতদিন পূর্বে কুত্বব হয়ে গেছেন।” আর শায়খ রাদ্বিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু আল্লাহ তা'আলার বাণী يُحِبُّهُمۡ وَيُحِبُّوۡنَهٗ (তিনি তাদেরকে ভালবাসেন, তারাও তাকে ভালবাসে) প্রসঙ্গে বলেছেন, তারা হৃদয়ের চক্ষু দ্বারা দেখেছেন, অলসতার বােরকাগুলােকে রহস্যাবলীর চেহারা থেকে তুলে দিয়েছেন, অদৃশ্য জগতকে লােকজনের সামনে হৃদয়গুলাের আয়নার পরিচ্ছন্নতা সহকারে দেখেছেন, অলঙ্কার শাস্ত্রের মুক্তাগুলােকে ওহীর কলেমাগুলাের মালার উপর বিসর্জন দেয়ার জন্য কুঁড়িয়ে নিয়েছেন, অনাদিকালের হিকমত বা প্রজ্ঞাসমূহে বসন্তকালের বাগানগুলােতে রহস্যাবলী অনুধাবনের চক্ষু দ্বারা বিচরণ করেছেন, অনাদি কালের গুণাবলীর দুলহানদেরকে চিন্তা-ভাবনার চিরুনীগুলাে দ্বারা আঁচড়িয়ে শােভামণ্ডিত ও সজ্জিত করেছেন, আর এমনসব হৃদয় সহকারে হাযির করা হয়েছে যে, সেগুলাে অন্যান্য দেহের প্রতি মনােনিবেশই করেনি এবং তাদেরকে এমন পবিত্র আত্মসমূহ সহকারে হাযির করা হয়েছে, যেগুলাে ওইসব আকৃতির স্থানগুলাের সাথে ভালবাসা রাখতাে। পবিত্রতার মর্যাদাদির প্রান্তগুলাের দিকে মাটির আকৃতিগুলাের দেশ থেকে তাদের বিবেকসমূহ সহকারে বের করা হয়েছে। আর তারা আপন সাহসের অভিজাত আরােহীদের সাহায্যে ওয়াহদানিয়াতের মহত্ত্বের বাগানগুলাে তালাশ করতে থাকেন। তদুপরি, কোরআনের বাগানের খুশবুর ঘ্রাণ নেয়ার জন্য আপন আপন রূহের মগজ দ্বারা খুঁজেছেন। আর বলেছেন, আত্মসমূহে মাশক ও কলবগুলাের মাহবুব এবং অন্বেষণকারীদের চূড়ান্ত আশা- তার (অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টি থেকে চয়নকৃত হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছে। সুতরাং অনতিবিলম্বে আল্লাহ তা'আলা এমন সম্প্রদায়কে নিয়ে আসবেন, যারা তাকে ভালবাসবে এবং তিনিও তাদেরকে ভালবাসেন। তার অস্তিত্বহীনতার বিছানাগুলাের উপর অদৃশ্যের দোলনাগুলােতে শুয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। তারা দানের গৃহায় যুবক ছিলেন। তখন তাদের সত্তাগুলাের কণাগুলােকে মাটির অংশগুলাে থেকে প্রথম অদৃষ্ট বের করে এনেছে। পরিচ্ছন্নতার আগুন দ্বারা সেগুলাের আবর্জনা দূরীভূত করেছেন। আর يُحِبُّهُمۡ (অর্থাৎ তিনি তাদেরকে ভালবাসেন)-এর লাইনগুলােকে অনাদিকালের টাকশালে দান-দক্ষিণার স্বর্ণকার নকশা তৈরী করেছেন। তাদের পক্ষ থেকে, যখন তারা অস্তিত্বহীনতার আড়ালে ছিলেন, বললেন وَيُحِبُّوۡنَهٗ (এবং তারা তাকে ভালবাসে)। পশুগুলাের বুলিকে যুগের সুলায়মানই বুঝেন। আর আশিক্বদের চোখের ইশারাগুলাে ইশক্বের লায়লীর মাজনুন (আশেক্ব) ব্যতীত অন্য কেউ বুঝতে পারে না। যখন অনাদিকালের লিখক অনাদিকালের দপ্তরে রূহগুলাের পরিষ্কার ফলকগুলাের উপর মুহাব্বতের কালির সাহায্যে চয়ন করার কলম দ্বারা يُحِبُّهُمۡ وَيُحِبُّوۡنَهٗ (তিনি তাদেরকে ভালবাসেন, তারাও তাকে ভালবাসেন)-এর এগুলাে লিখেছেন, তখন তাদের অস্তিত্বের উপাসনালয়গুলাের দরবেশগণ অস্তিত্বহীনতার মধ্যে ছিলেন, অদৃশ্যের পর্দাগুলাের ঝিনুকে তাদের সত্তার মণিমুক্তাগুলাে লুকায়িত ছিলাে আর কুন (হয়ে যাও)-এর পর্দাগুলাের বৃক্ষরাজির ছায়াতলে তাদের প্রাণগুলাের সাথীগণ ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। অতঃপর তাকদীরের মুআযযিন ফাইয়াকূন' (অতঃপর সেটা হয়ে যায়) এর মনােরম হাওয়া দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করেছেন। তারপর দুনিয়ার অন্ধকার তাদের অস্তিত্বের প্রদীপগুলাের আলাে দ্বারা আলােকিত হয়ে গেছে। তাদের প্রাণগুলাে আকৃতির মহলসমূহে অবস্থান করতে থাকে। তারপর সেগুলাের পরিচ্ছন্নতা সেগুলাের আবর্জনার সাথে মিশে গেছে। সেগুলাের নূর দৈহিক উপাদানগত অন্ধকারের সাথে একাকার হয়ে গেছে। রুহগুলাে মুসাফিরের মহলে দূরবর্তী শহরগুলােতে গিয়ে অবতরণ করেছে। অতঃপর সেগুলাে অনাদিকালীন দরবার থেকে যা দ্বারা চমকিত হয়েছে, সত্তার মধ্যে যেই আলাে দেখেছিলাে, সেটার প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েছে। আর পবিত্র স্থানগুলাের মধ্যে যে জিনিষের প্রতি আসক্ত ছিলাে, সেটার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সেগুলাের দীর্ঘদিন যাবৎ চড়াই-উৎরাই চলতে থাকে। ইশকের ময়দানে তাদের অস্তিত্বের কণাগুলাে উড়ন্ত কণা হয়ে গেলাে। আর যখন তারা নৈকট্যের ময়দানের দিকে বের হলেন, তখন দয়ার হাত তাদের সবাইকে ভালবাসার ওই পােষাকসমূহ পরিয়ে দিলাে, যেগুলােকে তাক্বদীর নির্ধারণকারী তাদের জন্য নির্ধারণ করেছেন। আর তাদের বিশেষ লােকদেরকে ভালবাসার মজলিসের নির্জনতায় يُحِبُّهُمۡ وَيُحِبُّوۡنَهٗ (তিনি তাদেরকে ভালবাসেন, তারাও তাকে ভালবাসেন)-এর ঝাণ্ডাগুলাে উডীন করলেন। তাদের আগমনের জন্য وَسَارِعُوۡا (তােমরা ত্বরা করাে) এর সমুদ্রের তীরে সম্মানের খাটগুলাে স্থাপন করেছেন। অনাদি কালের কাছারীর লেখককে নির্দেশ দিলেন বড় সৌভাগ্যের ফরমান তাদের জন্য লিখে দিতে আর সেটার লিপিকে وَاللّٰهُ يَدۡعُوۡ اِلٰی دَارِ السَّلَامِ (আল্লাহ তা'আলা দারুস সালাম বা শান্তি নিকেতনের দিকে আহ্বান করছেন)-এর মােহরের উপর সমাপ্ত করেছেন। আর সেটার সম্বোধনের ঠিকানা (বিষয়বস্তু) রেখেছেন- فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ (তাহলে তােমরা আমার অনুসরণ করাে, আল্লাহ তােমাদেরকে ভালবাসবেন) এবং তাকে এ মহান বার্তা সহকারে قَدۡلجَآءَکُمۡ مِّنَ اللّٰہِ نُوۡرٌ (নিশ্চয় তােমাদের নিকট আল্লাহর নিকট থেকে নূর এসেছে)-এর টগবগে অশ্বের উপর আরােহন করিয়ে পাঠিয়েছেন। হে সম্বােধিত জন! এ রহস্যাবলীর খাট মাটির ধরনের তাঁবুগুলাের মধ্যে স্থাপন করা হয়। আর ইয়াকীনের চোখে তাওহীদের রেখাবিন্দু অস্তিত্ব-প্রাসাদের ভিতে দেখা যায়। আল্লাহ্ তা'আলা এরশাদ করেন- هُوَ الۡاَوَّلُ وَ الۡاٰخِرُ وَ الظَّاہِرُ وَ الۡبَاطِنُ (তিনি সর্বপ্রথম, তিনিই সর্বশেষ, তিনিই প্রকাশ্য, তিনিই অপ্রকাশ্য)।
(উল্লেখ্য এ আয়াত যেমন আল্লাহর প্রশংসাকারী, তেমনি নবী-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এরও।) (বাহজাতুল আসরার,১০৩,১০৪,১০৫,১০৬)
%20majlisbd%20%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%B6%20%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE.jpg)